ইউএস-বাংলা বিমান দুর্ঘটনা: ক্ষতিপূরণ পেতে জটিলতা

ইউএস-বাংলা বিমান দুর্ঘটনা: ক্ষতিপূরণ পেতে জটিলতা

লাশের জন্য দুঃসহ অপেক্ষায় স্বজনরা
ঢামেকে ভর্তি মেহিদি-স্বর্ণ-অ্যানি
বাংলাদেশ মন্ট্রিয়াল চুক্তিতে স্বাক্ষর করে, কিন্তু সেটি এখনও অনুমোদন পায়নি। তাছাড়া ঐ চুক্তিতে এখনো স্বাক্ষর করেনি নেপাল

নিজস্ব প্রতিবেদক : বিমান দুর্ঘটনায় নিহত বা আহত যাত্রীরা স্বাভাবিকভাবেই ক্ষতিপূরণ পেয়ে থাকেন। তবে কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের উড়োজাহাজ বিধ্বস্তের ঘটনায় হতাহতদের পরিবার ক্ষতিপূরণ পেতে জটিলতায় পড়তে পারে। ‘মন্ট্রিয়াল চুক্তি ১৯৯৯’-এ বাংলাদেশ ও নেপালের স্বাক্ষরের বিষয়টি বিলম্ব হওয়ার কারণে এই জটিলতা তৈরি হয়েছে বলে কাঠমান্ডু পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

তারা জানায়, ১৯৯৯ মন্ট্রিয়াল চুক্তিতে বাংলাদেশ ও নেপালের স্বাক্ষরের বিষয়টি বিলম্বিত হওয়ায় এই জটিলতা তৈরি হয়েছে। ১৯৯৯ সালের ২৮ মে বাংলাদেশ চুক্তিতে স্বাক্ষর করলেও আনুষ্ঠানিকতা শুরু করেনি। নেপাল এখনও স্বাক্ষরই করেনি। ২০১০ সালে উদ্যোগ নিলেও শেষ পর্যন্ত সই করেনি তারা। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে শুধু ভারত, পাকিস্তান ও মালদ্বীপ এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে।

মন্ট্রিয়াল চুক্তির ২১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, দুর্ঘটনায় যাত্রী মারা গেলে এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ নিহত প্রত্যেক যাত্রীর পরিবারকে ১ লাখ ৪৫ হাজার ৪৬২ ডলার (প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ ৮৭ হাজার টাকা) করে দিতে বাধ্য। সব এয়ারলাইন্সই এই ক্ষতিপূরণের জন্য ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির কাছে বীমা করে থাকে। যাত্রী ও তাদের পরিবারকে এই ইন্স্যুরেন্স সম্পর্কে আগেই জানাতে হয়। তবে নেপাল ওয়ারস কনভেনশনে স্বাক্ষর করায় এয়ারলাইন্সকে এখন প্রত্যেক যাত্রীর জন্য ২০ হাজার ডলার দিতে হবে। দেশটির বীমা প্রতিষ্ঠান সাগমাথার কর্মকর্তা সুভাষ দিক্ষিত বলেন, এমন দুর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণের ক্ষেত্রে দু’রকম নীতির মধ্যে পড়তে হবে নেপালকে।

গত সোমবার ঢাকা থেকে রওনা দিয়ে দুপুর ২টা ২০ মিনিটে কাঠমান্ডু বিমানবন্দরে পৌঁছায় বিমানটি। অবতরণের সময় বিমানটিতে আগুন ধরে যায়। এরপর বিমানবন্দরের কাছেই একটি ফুটবল মাঠে বিধ্বস্ত হয় এটি। দুর্ঘটনায় ৫১ জন নিহত হন। এর মধ্যে ২৬ জন বাংলাদেশি। নেপালেরও রয়েছেন বেশ কয়েকজন।

মনট্রিয়াল চুক্তিই এয়ারলাইন্সগুলোর মধ্যে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ও গ্রহণযোগ্য সমঝোতা। ১৯৯৯ সালে ইন্টারন্যাশনাল সিভিল এভিয়েশন অর্গানাইজেশনের সদস্য দেশগুলো এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। এই সমঝোতায় বলা হয়, যেকোনও যাত্রীর হতাহতের জন্য বিমান কর্তৃপক্ষই দায়ী থাকবে।

নেপালের পর্যটন মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, এই সমঝোতায় স্বাক্ষর করার বিষয়টিকে কখনোই গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। এই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তবে খুব ধীরগতির। তবে ওই সমঝোতার একটি কপি আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। ওই কর্মকর্তা বলেন, আইন মন্ত্রণালয় অনুমোদন দিলে এটি মন্ত্রিসভায় যাবে। এরপর আলোচনা হবে পার্লামেন্টে। এই সমঝোতা বাস্তবায়নে নতুন আইন প্রয়োজন মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘অবশ্যই এটা এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষকে বহন করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদে এটি বিমান কর্তৃপক্ষকে আরও দায়িত্বশীল করে তুলবে। নেপালি স্থানীয় এয়ারলাইনগুলোর দাবি, আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ বিমান চলাচলে এই ক্ষতিপূরণের পরিমাণ যেন সমান না হয়। মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা বলেন, আমরা মনে করি যাত্রীরা যেখানেই ভ্রমণ করুক, তারা সবাই সমান। নেপালের ক্ষেত্রে আমরা ১৯২৯ সাল থেকে ওয়ারস সমঝোতা মেনে চলছি। সে অনুযায়ী প্রত্যেক যাত্রীর ৮ হাজার ৩০০ ডলার পাওয়ার কথা। তবে ১৯৫৫ সালের সেপ্টেম্বরে হেগে এটির সংশোধন করা হয়। হেগ প্রটোকল অনুযায়ী সেটা গিয়ে দাঁড়িয়েছে ২০ হাজার ডলারে।

লাশের জন্য দুঃসহ অপেক্ষায় স্বজনরা
নেপালের ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইউএস-বাংলার বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় আহত বাংলাদেশিরা হাসপাতাল ছাড়তে শুরু করেছেন। তবে দুর্ঘটনায় নিহতের স্বজনদের দুঃসহ অপেক্ষার প্রহর শেষ হচ্ছে না। এখনও (১৬ মার্চ, শুক্রবার পর্যন্ত) হারানো স্বজনের লাশ বুঝে পাননি। কেউ কেউ লাশ শনাক্তই করতে পারেননি। নেপালের অবস্থানরত নিহতদের স্বজনদের মধ্যে বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে এ বিষয়ে নিশ্চিত করা গেছে। তাদের অনেকেই কোনও মন্তব্য করতে রাজি হননি। তারা বলছেন, আমরা এখন শুধুই লাশের জন্যে অপেক্ষায় আছি। যত দ্রæত সম্ভব আমরা লাশ নিয়ে ফিরতে চাই। নিহত ক্রু খাজা মুহাম্মদ শফির বোন বাসিমাহ সাইফুল্লাহ বলেন, আমরা অপেক্ষা করতে করতে ক্লান্ত। কী বলবো? নিজেই নিজের সঙ্গে কথা বলতে পারছি না। প্রথমে চেয়েছিলাম লাশ দেখতে। এখন চাইছি যত দ্রæত সম্ভব লাশ নিয়ে ফিরতে। তিনি আরও বলেন, আমরা চাই দুর্ঘটনায় নিহতদের যাতে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয় এবং লাশ হস্তান্তরের সময় যাতে আমাদের সঠিক লাশটি দেওয়া হয়। বিমান বিধ্বস্তের চার দিন পার হলেও নিহত ২৬ জন বাংলাদেশির মধ্যে কেবল আট জনের পরিচয় শনাক্ত করা গেছে। অন্যদের ডিএনএ স্যাম্পল নিয়ে প্রোফাইলিং শেষে তবেই স্বজনদের হাতে তুলে দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। তাই এখনও নিশ্চিত করে জানা যাচ্ছে না, বাকি ১৭ জনের মরদেহ কবে নাগাদ ফেরত পাওয়া যাবে। এই অনিশ্চয়তা নিয়েই হাসপাতালের আশেপাশে উৎকণ্ঠায় দিন গুণছেন স্বজনরা।
গত সোমবার (১২ মার্চ) নেপালের ত্রিভুবন বিমানবন্দরে ইউএস-বাংলা’র একটি বিমান ৬৭ জন যাত্রী ও চার জন ক্রু নিয়ে বিধ্বস্ত হয়। এতে ৫১ জন নিহত হন। এর মধ্যে ২৬ জন বাংলাদেশি।

এদিকে, আহত ১০ জনের মধ্যে তিন দিনে ৫ জন নেপালের হাসপাতাল ছেড়েছেন। তারা হলেন- ড. রেজওয়ানুল (ওএম থেকে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়েছে), শাহরিন আহমেদ (কেএমসি থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে), মেহেদী, স্বর্ণা ও অ্যানি (কেএমসি থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে)। বাকি পাঁচ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এর মধ্যে কেএমসিতে চার জন চিকিৎসাধীন। তারা হলেন- শাহিন বেপারী, ইমরানা কবীর হাসি, মো. কবির হোসেন, শেখ রাশেদ রুবায়েত। এছাড়া এয়াকুব আলী নরভিক হাসপাতালে রয়েছেন।




মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Time limit is exhausted. Please reload CAPTCHA.