অভিনব কায়দায় হজ-বাণিজ্য, চলছে প্রতারণা

অভিনব কায়দায় হজ-বাণিজ্য, চলছে প্রতারণা

বিশেষ প্রতিনিধি: অভিনব কায়দায় চলছে হজ-বাণিজ্য। হজ লাইসেন্সের মালিকরা জড়িয়ে পড়ছেন নানারকম অনিয়ম, দুর্নীতি ও প্রতারণার সঙ্গে। হজযাত্রীদের কাছ থেকে টাকা নিয়েও সৌদি আরবে না পাঠানো কিংবা তাদের দেখভাল না করে ফেলে আসা, মোয়াল্লেম ফি না দেওয়াসহ প্রতারণার অজস্র অভিযোগ তাদের বিরুদ্ধে। এসব অপরাধে গত কয়েক বছর ধরে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় দোষী হজ এজেন্সির মালিকদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলকব্যবস্থা (লাইসেন্স বাতিল ও স্থগিত, জামানত বাজেয়াপ্ত, আর্থিক জরিমানা) নিলেও থেমে থাকছে না তাদের কার্যক্রম। মন্ত্রণালয়ের শাস্তির বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করে কেউ কেউ লাইসেন্স ফিরে পেয়ে আবারো শুরু করেন হজ-ব্যবসা। আবার নিজের নামের লাইসেন্স বাতিল বা স্থগিত হলেও সমস্যা নেই। কারণ অধিকাংশ হজ এজেন্সির মালিকেরই রয়েছে নামে-বেনামে (আত্মীয়-স্বজন বা কর্মকর্তাদের নামে) একাধিক লাইসেন্স। এছাড়া অন্যের লাইসেন্স ভাড়া নিয়ে হজযাত্রী সংগ্রহ করেও চালিয়ে যান অভিনব কায়দায় হজ-ব্যবসা। এভাবে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন তারা। বছরের পর বছর এভাবেই চলে আসছে হজ এজেন্সির এমন কার্যক্রম। অভিনব এ হজ-ব্যবসার সঙ্গে ঘুরেফিরে একই ব্যক্তিবর্গের নামই বেশি আসছে। তবে প্রতিবছর নতুন নামও যুক্ত হওয়ার তালিকাও কম নয়। ২০১৭ সালে হজ কার্যক্রমে অনিয়ম ও প্রতারণার অভিযোগে ৪ দফায় ১৬৪টি এজেন্সির বিরুদ্ধে শাস্তিমূলকব্যবস্থা নিয়েছে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়। যাদের মধ্যে অধিকাংশেরই লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। বিভিন্ন মেয়াদে লাইসেন্স স্থগিত, জামানত বাজেয়াপ্ত বা ৫০ হাজার থেকে কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানাও করা হয়েছে অনেক এজেন্সির মালিককে। কিন্তু, প্রতিবছরের মতো অভিযুক্ত এসব এজেন্সির মালিকও ফাঁকফোকড় দিয়ে বেরিয়ে শাস্তি মওকুফ কিংবা ভিন্ন এজেন্সির নামে তাদের হজ-ব্যবসা চালিয়ে যাবেন বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। গত শনিবার ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সহকারী সচিব (হজ) এসএম মনিরুজ্জামান স্বাক্ষরিত একটি বিজ্ঞপ্তি মন্ত্রণালয়ের ওয়েব সাইটে প্রকাশ করা হয়। বিগত হজ মৌসুমে (২০১৭) মোয়াল্লেম ফি পরিশোধ না করা বা আংশিক পরিশোধ বা বিলম্বে পরিশোধ, লাইসেন্স ভাড়া দেওয়াসহ নানা অভিযোগ আমলে নিয়ে ধর্ম মন্ত্রণালয় গঠিত ৩টি তদন্ত কমিটি ১১টি এজেন্সির বিরুদ্ধে লাইসেন্স বাতিল, স্থগিতসহ আর্থিক জরিমানার শাস্তিমূলকব্যবস্থা গ্রহণ করে।
শাস্তিপ্রাপ্ত হজ এজেন্সির তালিকায় ঢাকা হজ কাফেলা অ্যান্ড ট্রাভেলস (লাইসেন্স নম্বর-০৭৩২), মিসফালাহ ট্রাভেলস (১০১৮), সানজিদ ট্রাভেলস ইন্টারন্যাশনাল (০১২৯) ও গুলশান-এ মুহাম্মাদিয়া ট্রাভেলস (০৭৯৮) নামে ৪টি এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। এদের মধ্যে ঢাকা হজ কাফেলা অ্যান্ড ট্রাভেলস হজ এজেন্সিটির মালিক হাবিবুর রহমান নামের এক ব্যক্তি। এই লাইসেন্সটি মৌখিকভাবে ভাড়া নিয়ে হজ কার্যক্রম পরিচালনা করেন রেজাউল করিম উজ্জল নামের একজন। যিনি ব্রাইট ট্রাভেলস (০০৪২)-এরও মালিক। উজ্জলকে মৌখিকভাবে হাবিবুর রহমান তার লাইসেন্স (ঢাকা হজ কাফেলা অ্যান্ড ট্রাভেলস) পরিচালনার অনুমতি দেওয়ায় হজ নীতিমালা ২০১৭-র ২৩ ধারা অনুযায়ী এজেন্সির জামানত বাজেয়াপ্তসহ লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। অন্যদিকে ব্রাইট ট্রাভেলসের লাইসেন্স স্থায়ীভাবে বাতিল ও ১০ লাখ টাকা জরিমানা করেছে ধর্ম মন্ত্রণালয়। অন্যদিকে, হজযাত্রীদের সাথে প্রতারণার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ব্রাইট ট্রাভেলসের মালিক রেজাউল করিম উজ্জল নামে ফৌজদারি মামলা করার জন্য অভিযোগকারীদের নির্দেশ দিয়েছে ধর্ম মন্ত্রণালয়। ব্রাইট ট্রাভেলসের মালিক রেজাউল করিম উজ্জলের বিরুদ্ধে এর আগেও অনিয়মের অভিযোগে লাইসেন্স বাতিলসহ আর্থিক দÐ দেওয়া হয়। হজে লোক পাঠাতে গিয়ে নানা অনিয়মের অভিযোগে ২০১৫ সালে এ এজেন্সিকে নিষিদ্ধ করে ধর্ম মন্ত্রণালয়। এরপর তিনি ‘মিস ফালাহ ট্রাভেলস’ নামে একটি এজেন্সি ‘ভাড়া’ নিয়ে হজে লোক পাঠান বলে জানা যায়। শুধু রেজাউল করিম উজ্জলই নন। ৪ দফায় এ বছর শাস্তিপ্রাপ্ত হজ এজেন্সির মালিকদের অনেকেই আছেন এই তালিকায়। হজ কার্যক্রম পরিচালনাসহ নানা অনিয়ম প্রসঙ্গে রেজাউল করিম উজ্জল নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন। তিনি বলেন, যারা হজ কার্যক্রম পরিচালনা করেন, কম-বেশি সবার বিরুদ্ধেই নানা অভিযোগ আসে। পাবলিক সার্ভিস, মানুষকে সন্তুষ্ট করা যায় না। আর দ্বিতীয়ত হলোÑ আমি এবার হাবের নির্বাচনে মহাসচিব প্রার্থী নির্বাচন করে পরাজিত হই। হাবের মহাসচিব তসলিম আমার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। এছাড়া এবার সৌদি আরবে যখন একজন হজযাত্রীর কাছ থেকে মোয়াল্লেম ফি বাবদ ৫০০ রিয়ালের পরিবর্তে ১৫শ রিয়াল আদায় করলো, আমি এর প্রতিবাদ করি, সৌদিও মোয়াসসাসা, ধর্ম মন্ত্রণালয় ও হাবের নেতারা আমার ওপর ক্ষুব্ধ হয়। এদের সাথে সম্পর্কের অবনতি হয়। লাইসেন্স ভাড়া নিয়ে ব্যবসা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ঢাকা হজ কাফেলা অ্যান্ড ট্রাভেলসের লাইসেন্স আমি ভাড়া নেইনি। আমার কিছু হাজি ছিল, তার কিছু ছিল। দুইজন মিলে লাইসেন্সটি ব্যবহার করেছি। এজন্য আমার লাইসেন্স বাতিল হবে কেনÑ বুঝতে পারলাম না। ব্যক্তিগতভাবে আমি অপরাধ করলে শাস্তি হতে পারে, কিন্তু যেখানে আমি তার লাইসেন্স ভাড়া নেইনি, কেন আমার লাইসেন্স বাতিল করা হলো? প্রশ্ন রেজাউল করিম উজ্জলের। ধর্ম মন্ত্রণালয়ের এ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা চ্যালেঞ্জ করে আদালতের শরণাপন্ন হবেন বলেও জানান তিনি। ২০১৫ সালে অনিয়মের অভিযোগে লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছিল স্বীকার করে উজ্জল জানান, পরে হাইকোর্টে রিট করে ‘ব্রাইট ট্রাভেলস’র লাইসেন্স ফিরে পেয়েছি। এ ব্যাপারে বাতিল হওয়া ঢাকা হজ কাফেলা অ্যান্ড ট্রাভেলস হজ এজেন্সির ওয়েব সাইটে দেওয়া এর মালিক হাবিবুর রহমানের মোবাইল নম্বরে কল দিলে তা বন্ধ পাওয়া যায়। দুটি টেলিফোন নম্বরের মধ্যে একটি বন্ধ। অপরটি রিসিভ হলেও এটি ঢাকা হজ কাফেলা অ্যান্ড ট্রাভেলস হজ এজেন্সির নম্বর নয় বলে ও প্রান্ত থেকে একজন জানান। অন্যদিকে এ ব্যাপারে বক্তব্য নিতে হজ এজেন্সির মালিকদের সংগঠন হাবের মহাসচিব শাহাদত হোসেন তসলিমের মোবাইলে একাধিকবার কল দিলেও তিনি রিসিভ করেননি।
এ ব্যাপারে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনিছুর রহমান জানান, বিগত বছর হজ কার্যক্রমে অংশ নেওয়া এজেন্সিগুলোর মধ্য থেকে ১৯৩টি এজেন্সির বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। আমরা এ ব্যাপারে তদন্ত কমিটি করে দেই। তদন্ত কমিটির রিপোর্ট অনুযায়ী ৪ দফায় ১৬৪টি এজেন্সির বিরুদ্ধে লাইসেন্স বাতিল, স্থগিত, জামানত বাজেয়াপ্ত, আর্থিক জরিমানার শাস্তি প্রদান করা হয়েছে। শাস্তিপ্রাপ্তদের অনেকেই রিভিউ করেছেন বা করছেন। চলতি সপ্তাহ বা আগামী সপ্তাহ থেকে রিভিউ শুরু হবে। অভিযোগের বিপরীতে তাদের যুক্তি শুনে চ‚ড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।




মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Time limit is exhausted. Please reload CAPTCHA.